সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা ‘বন্ধ’ করার ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি, তবু এই পদক্ষেপ ওয়াশিংটন ও কারাকাসের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র করেছে। ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে মাসের পর মাস ধরে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করায় এই ঘোষণা আরও প্রভাবশালী মনে হচ্ছে।
ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার নৌযানগুলোকে মাদক বহনের অভিযোগে লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং দেশটির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে— ট্রাম্প কি সত্যিই মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছেন? হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ আইনসঙ্গত হবে কি? আল জাজিরা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজেছে।
ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ঔপনিবেশিক হুমকি’ তৈরি করার অভিযোগ করেছে এবং দেশটির জনগণ অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আগেই সতর্ক করেছেন, ওয়াশিংটন ভুয়া অভিযোগ তৈরি করে সামরিক হস্তক্ষেপের অজুহাত তৈরি করতে পারে।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ভেনেজুয়েলা নিয়মিত সামরিক মহড়া করছে এবং সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতিতে বড় সমাবেশের আয়োজন করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন গত সেপ্টেম্বর থেকে মাদক বহনকারী নৌকা লক্ষ্য করে আক্রমণ চালাচ্ছে, তবে ওয়াশিংটন এই নৌকাগুলো সত্যিই মাদক বহন করছে কিনা তার প্রমাণ দেখায়নি। এই হামলায় অন্তত ৮৩ জন নিহত হয়েছেন।
সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রভাবশালী গোষ্ঠী ‘কার্টেল দে লস সোলেস’-কে যুক্তরাষ্ট্র ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ওয়াশিংটন দাবি করছে, মাদক পাচারের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মীরা সতর্ক করেছেন, এটি মাদুরোকে বেআইনিভাবে ক্ষমতাচ্যুত করার পথ তৈরি করছে।
ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপ কি আইনসঙ্গত?
সমালোচকরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ মার্কিন সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করছেন, নৌকায় চালানো হামলাগুলো আসলে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ক্যারিবিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ বৈধ।
মাদুরোর প্রতিক্রিয়া
ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা বন্ধের ঘোষণা কারাকাসে তীব্র নিন্দার মুখে পড়েছে। ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটিকে ‘সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন ও অন্যায্য আগ্রাসন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। মাদুরো শান্তি এবং আলোচনার পক্ষে থাকলেও তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, প্রয়োজন হলে দেশকে ‘সাম্রাজ্যবাদী হুমকি’ থেকে রক্ষা করা হবে।
ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতা কেন বাড়ছে?
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদ এবং পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির পেছনে রয়েছে। হুগো চাভেজের ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। ট্রাম্প মাদুরোর রাষ্ট্রকে অপরাধী সিন্ডিকেট হিসেবে উপস্থাপন করে দেশটির রাজনৈতিক–অর্থনৈতিক কাঠামোকে অকার্যকর করার চেষ্টা করছেন।
মাদক সত্যিই ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছে কি না?
ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ‘নারকো-টেররিজম’ প্রচারণা চালাচ্ছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ফেন্টানাইল সংকটের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার খুব সামঞ্জস্য নেই। মূলত মেক্সিকোতে উৎপাদিত ফেন্টানাইল দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে বৈধ বন্দর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
কিছু ইউরোপীয় দেশ মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। কলম্বিয়া, ব্রাজিল, রাশিয়া ও চীনও ট্রাম্পের পদক্ষেপকে নিন্দা জানিয়েছে।
‘মাগা’ সমর্থকদের বিভাজন
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ‘মাগা’ সমর্থকদের মধ্যেও ভেনেজুয়েলা নিয়ে পদক্ষেপকে ঘিরে মতভেদ দেখা দিয়েছে। কেউ সীমিত অভিযান সমর্থন করলেও অনেকে বিদেশি যুদ্ধে জড়ানোর বিরোধী।