দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে টানা ঝড়, ভারী বৃষ্টি ও ভূমিধসে পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা ইতোমধ্যে ১ হাজার ১৪০ ছাড়িয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও বহু মানুষ। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এলাকাগুলোতে উদ্ধারকর্মীরা হিমশিম খাচ্ছেন। খবর আল জাজিরা।
ইন্দোনেশিয়ায় ব্যাপক বিপর্যয়
সোমবার উত্তর সুমাত্রা সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো বলেন, সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার এখন যত দ্রুত সম্ভব ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। তিনি জানান, এখনও বেশ কয়েকটি দুর্গম গ্রামে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি; হেলিকপ্টার ও বিমান পাঠানো হচ্ছে। দেশটিতে বন্যা ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৬০৪ জনের মৃত্যু এবং ৪৬৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। পরিস্থিতি এতটাই সংকটপূর্ণ যে প্রাবোওর ওপর জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার চাপ বাড়ছে।
যদিও তিনি দাবি করেছেন—‘সবচেয়ে খারাপ সময় কাটিয়ে উঠেছি’—তবে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, জাকার্তা ও আশপাশে আরও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি, বজ্রঝড় ও ঝোড়ো হাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সরকার ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে সহায়তা পৌঁছাতে দুইটি হাসপাতাল জাহাজ এবং তিনটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে। অনেক সড়ক এখনো অচল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টিটো কারনাভিয়ান স্বীকার করেছেন, এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশটি প্রস্তুত ছিল না।
শ্রীলঙ্কায় বহু প্রাণহানি
সাইক্লোন ‘ডিটওয়াহ’-র কারণে বন্যা ও ভূমিধসে শ্রীলঙ্কায় কমপক্ষে ৩৬৬ জনের মৃত্যু এবং ৩৬৭ জন নিখোঁজ। দেশটি আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইছে এবং আটকে পড়াদের উদ্ধারে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার ব্যবহার করছে। লুনুভিলায় জরুরি অবতরণের সময় এক ত্রাণবাহী হেলিকপ্টারের পাইলট মারা গেছেন। প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিশানায়েকে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে এটিকে ‘দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়’ আখ্যা দিয়েছেন।
ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও জাপানের উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে কাজ করছে, তবে আরও আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।
থাইল্যান্ডে বন্যার ক্ষোভ
থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে বন্যায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ১৭৬–তে দাঁড়িয়েছে। ত্রাণ কার্যক্রম চললেও জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। ব্যর্থতার অভিযোগে দুই স্থানীয় কর্মকর্তা বরখাস্ত হয়েছেন।
সেভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছে, ৭৬ হাজার শিশু এখনও স্কুলে ফিরতে পারছে না। সঙখলা প্রদেশেই ১৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে পরিষেবা; ট্যাপ ওয়াটারের ৮০ শতাংশ সরবরাহ ফিরেছে।
মালয়েশিয়ায় ক্ষয়ক্ষতি
মালয়েশিয়ার পার্লিস প্রদেশে ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যায় অন্তত তিন জনের মৃত্যু হয়েছে।
চরম আবহাওয়ার ক্রমবর্ধমান তাণ্ডব
গত কয়েক সপ্তাহে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একের পর এক প্রবল ঝড়, টাইফুন ও বৃষ্টিপাতে বিপর্যয় নেমে এসেছে। গত নভেম্বরেই ফিলিপাইনে দুই দফা টাইফুনে ২৪২ জনের মৃত্যু হয়। সুমাত্রায় আঘাত হানা এক বিরল ট্রপিক্যাল ঝড় ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার বন্যা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝড়ের তীব্রতা ও বর্ষণের মাত্রা দ্রুত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস–রেড ক্রিসেন্টের এশিয়া-প্যাসিফিক পরিচালক আলেকজান্ডার মেথিওর মতে, এখনই আরও উন্নত পূর্বাভাসব্যবস্থা, নিরাপদ আশ্রয়, প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান এবং দুর্যোগ-সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে হবে—নইলে বিপর্যয় আরও ঘন ঘন ও ভয়াবহ হবে।