শুরু হলো ডিসেম্বর—মহান বিজয়ের মাস। বাঙালির ইতিহাসে এমন আর কোনো মাস নেই, যা একই সঙ্গে গৌরব, অশ্রু, স্বপ্ন আর আত্মত্যাগের স্মৃতি বহন করে।
১৯৭১ সালে অস্ত্রের মুখে দাঁড়িয়ে যে জাতি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ের প্রত্যাশায় স্বাধীনতার পথ বেছে নিয়েছিল, সেই জাতির সামনে আজও সেই আকাঙ্ক্ষা অনেকটাই অপূরণ রয়ে গেছে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যে স্বপ্নের জন্ম হয়েছিল, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৫৪ বছরে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে বাংলাদেশ একাধিকবার আশা ও হতাশার রোলার কোস্টার পার করেছে।
স্বাধীনতার পরপরই শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকে ঘিরে প্রশাসনিক অনিয়ম, কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা ও রাজনৈতিক সংকীর্ণতার অভিযোগ সামনে আসে। পরবর্তী বছরগুলোতে দেশ সরাসরি সামরিক শাসনের অভিজ্ঞতা লাভ করে—নয়া জাতীয়তাবাদী চেতনায় চরম বিশৃঙ্খল একটি দেশে জিয়ার ক্ষমতা নেবার পর দেশে স্থিতিশীলতা এলেও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে তিনি নিহত হবার পর আবার বাংলাদেশ পথ হারায়। এরশাদের সময় দেশে অনেক অবকাঠামোগত উন্নতি হলেও দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পায়, একদলীয় নিয়ন্ত্রণ, দমন-পীড়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জাতি ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান নতুন করে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনে ঠিকই, কিন্তু দলীয় রাজনীতির তীব্র দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রশাসনের রাজনীতিকরণ সেই অর্জনকে দুর্বল করে দেয়।
গণতন্ত্রের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে বাংলাদেশ আবারও ক্ষমতার একচ্ছত্র কেন্দ্রীকরণে আটকে পড়ে। বিশেষ করে ২০০৯ সালের পর দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ক্রমশ নিয়ন্ত্রণবাদী হয়ে ওঠে। দুর্নীতিগ্রস্থ উন্নয়নের বুলির আড়ালে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধার অভিযোগ জমা হতে থাকে। একই সময়ে বড় উদ্বেগ তৈরি করে দুর্নীতি—২০২২ সালের ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল সূচকে ১৮০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৭; চলমান হিসাব অনুযায়ী বছরে গড়ে ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি দুর্নীতি অর্থনীতির রক্তক্ষরণ ঘটায়। অর্থ পাচারের পরিমাণ আরও শঙ্কাজনক—বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার হিসাব অনুযায়ী সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬৪০ কোটি ডলার, অর্থাৎ ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি বৈধ-অবৈধ পথে বিদেশে পাচার হয়েছে। এই টাকা পাচারের বড় অংশই বাণিজ্য ঘাটতি দেখিয়ে ইনভয়েস ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে ঘটেছে।
তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে—যা একধরনের বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। গত দুই দশকে দেশের জিডিপি প্রায় ৪ গুণ, রপ্তানি আয় ৫ গুণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বোচ্চ সময়ে ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছুঁয়েছিল। কৃষিতে বিপ্লবধর্মী পরিবর্তন এসেছে—ধান উৎপাদন বেড়েছে ১ কোটি ১০ লাখ টন থেকে ৩ কোটি ৮০ লাখ টন, সবজিতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদক, মাছ উৎপাদনে তৃতীয়, ভুঁড়ির দুধ উৎপাদনে অষ্টম, । খাদ্যঘাটতিতে থাকা দেশ থেকে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে খাদ্যে কছিুটা স্বয়ংসম্পূর্ণ ।
এ অর্থনৈতিক অগ্রগতি, বিশেষ করে কৃষির শক্ত ভিত, দেশের স্থিতিশীলতার অন্যতম ভরকেন্দ্র হয়ে আছে। কিন্তু উন্নয়নের এই আলোকচ্ছটাকে দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থপাচার ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ঘনঘটা ক্রমেই আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।
২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার পতন সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তেজনার চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। স্বৈরশাসন গুম,খুন, নির্বাচন ব্যবস্থার অবক্ষয়, আর্থিক দুর্নীতি, টাকা পাচার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে জমে থাকা ক্ষোভ তখন বিস্ফোরিত হয়। ৫ আগষ্টে আওয়ামী সরকারের পতন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মোড় এনে দেয়—ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার চেষ্টা শুরু করে। প্রশাসনের সংস্কার, মানবাধিকার পুনর্বহাল, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা—এইসব পুনর্গঠনের পথচলা শুরু হয়েছে নতুনভাবে।
এখন সামনে রয়েছে ২০২৬ সালের নির্বাচন—যা শুধুই আরেকটি নির্বাচন নয়, বরং রাষ্ট্রের নতুন ভিত্তি স্থাপনের সম্ভাব্য সূচনা। স্বাধীনতার স্বপ্ন—সাম্য, মর্যাদা, ন্যায়বিচার—যা ৫৪ বছর ধরে অপূর্ণ, নতুন করে সেই স্বপ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ।
বিজয়ের মাসের এই প্রভাতে তাই প্রশ্নটি নতুনভাবে ফিরে আসে:
এবার কি সত্যিই শুরু হতে পারে একটি সৎ, জবাবদিহিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের পুনর্জন্ম?
নাকি ইতিহাস আবারও আমাদের সেই অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে?
বাংলাদেশ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই—স্বাধীনতার অঙ্গীকার পূরণ হবে, নাকি আবারও স্থগিত থাকবে পরবর্তী প্রজন্মের কাঁধে।